এক জনমে ভালোবেসে…*

সালটা সম্ভবত ১৯৮৩ কিংবা ৮৪। কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকব। হাতে অফুরন্ত সময়। সারাদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর আড্ডা। তবে বেশীর ভাগ সময় পকেট একেবারে গড়ের মাঠ হয়ে থাকে। সে জন্যে চা খতে ইচ্ছা করলে পাড়ার বন্ধুদের কয়েকজনের বাসায় যেয়ে আড্ডা দিতে যেতাম। সেখানে বিনা মূল্যে চা এবং ভাগ্য প্রসন্ন হলে টাও মিলে যেতো। এ রকম একটা দিল দরিয়া পরিবারের বাসিন্দা ছিল আমাদের বন্ধু আড্ডা ক্লাবের সদস্য বাবু (আসল নাম না)। ওদের বাসায় গেলে বাবুর রুমে বসে আড্ডা দেওয়া যেতো। সাথে চা-টা খেয়ে তৃপ্ত হয়ে ফিরতাম। কিন্তু আমরা বেশ কিছু দিন বিরতি দিয়ে এই ধরণের বাড়িগুলোতে ঢু মারতাম। বেশি গেলে যদি আবার বিরক্তিকর কারণ হয়ে দাঁড়াই! একবার আমরা চার-পাঁচ জন বন্ধু মিলে চা-টা’র আশায় বাবুর বাসায় যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ও যেহেতু সেদিন তখনও আড্ডা দিতে আসে নি এবং বেশ কিছু দিন ওর বাসায় যাওয়া হয় না; আমাদের ধারণা হলো ও বাসায় থাকলে নির্ঘাত একটা জমপেশ সময় কাটিয়ে আসা যাবে।

বাবুর বাসাটা ছিল পাড়ার রাস্তার মোড়ের আড্ডা স্থল থেকে পাঁচটা গলি পরে। গন্তব্যের কাছাকাছি আসতেই বুঝলাম ওর বাড়ির পরিস্থিতি অন্য রকম। গলির মাথা থেকে বেশ মানুষের ভিড় ও কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পেলাম। আরেকটু যেতেই বাড়ির সামনে বাবুকে দেখলাম। পরনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী। হঠাৎ করেই মনে হলো ওর বয়স আরও ২০ বছর বেড়ে গেছে। আমাদেরকে দেখে বলল, “তোরা এসেছিস, ভালো করেছিস। আমার বাবা কয়েক ঘণ্টা আগে মারা গেছেন। তাঁকে কবর দিতে তোদের সাহায্য দরকার।” একটু থেমে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার গম্ভীর হয়ে বলতে লাগল, “ তিনি মারা গেছেন দুপুরের একটায়। এখন বাজে চারটা। অন্ধকার নামার আগে মাটি দেওয়ার কাজ শেষ করতে হবে।”

আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। লাশের খাটিয়া ধরে ট্রাকে উঠাতে সাহায্য করলাম। আমরাও মাথা নিচু করে আরেকটা গাড়িতে উঠলাম। কবরস্থান বেশি দূরে ছিল না। সব নিয়ম কানুন মেনে বাবুর বাবাকে কবরে শোয়ানো হলো। তারপরে আমরা অল্প অল্প করে মাটি দিয়ে কবর ভরা আরম্ভ করলাম। রক্তিম সূর্যটা তখন নিস্তেজ হয়ে হারিয়ে যাওয়া আরম্ভ করেছে। দূরে মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছিল। উপস্থিত স্বজনদের কয়েকজন কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছিলেন । অন্যরাও ছিল ভীষণ ভারাক্রান্ত। ঠিক এ রকম সময়ে এক বয়স্ক ভদ্রলোক সবাইকে অবাক করে অনেকটা স্বগতোক্তি করার স্বরে গেয়ে উঠলেন, “হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস……।” যারা এতক্ষণ কান্না চেপে রেখার চেষ্টা করছিলেন তারা সবাই ব্যর্থ হলেন। বাকীরা শব্দ করে না কাঁদলেও; মুখ দেখে বুঝা গেল তাদের বুকের ভিতরটা একেবারে একেবারে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে।

এই ঘটনার প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর আমার সাথে সদ্য প্রয়াত শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে দেখা হয়েছিল। একটা বাংলা রেডিও স্টেশনে তার ইন্টার্ভিউ নিয়েছিলাম। অবশ্য অনুষ্ঠান আরম্ভ হওয়ার আগে প্রায় ঘণ্টা খানেক তার সাথে কথা বার্তা হয়েছিল। তিনি প্রশ্ন করে আমার সাথে তার যোগ সূত্র বের করলেন। আমার যখন ৪/৫ বছর বয়স তিনি তখন রাজশাহীতে আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন। আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন। যদিও বিষয়টা আমার নিজের স্মরণে নাই। তবে আমি বাসার বড়দের কাছ থেকে শুনেছিলাম। কিন্তু তিনি এখন বিশাল বড় তারকা। আমার সংশয় ছিল এত দিন পর যদি সেটা তার মনে নাও করতে থাকতে পারে। কিংবা যদি ভাবেন আগ বাড়িয়ে নিজের কথা বলছি!**

তিনি এক সময়য়ে আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন আবিষ্কার করতেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন; ঠিক যেন আমি যেনো তার নিজের ছোট ভাই। সেই পুরনো দিনের কথাগুলো মহা উৎসাহে বলতে লাগলেন। যাই হোক, ফিরে আসি সেই ইন্টার্ভিউ প্রসঙ্গে। আমি আমার সেই বালক বয়সে বাবুর বাবাকে কবর দেয়ার সময়কার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। কথা বলতে বলতে তিনিও অশ্রু-সিক্ত হলেন। পরে তিনি আমাকে আবারও একবার জড়িয়ে ধরলেন। মনে হলো তিনি অনুধাবন করলেন তার গানের কথা সাধারণ মানুষের সব চেয়ে দুঃসময়ের সঙ্গী হয়ে গেছে। আমার মনে হলো একজন শিল্পীর কাছে এটা একটা ভীষণ বড় পাওয়া। আমি নিজেও তার ভালোবাসায় আপ্লুত হলাম।

যেই শিল্পীর সাধারণ মানুষের ‘বুকের মধ্যখানে হৃদয়ের যেখানে’ স্থান করে নিয়েছেন, তাকে বুঝি ‘এক জনমে ভালোবেসে…’ মন কোনোভাবেই ভরতে পারে না। যদিও তিনি (ডাক দিয়াছেন) দয়ালের ডাকে চলে গেছেন, তবে আমরা জানি তিনি যেখানেই থাকুন না কেনো, সৃষ্টিকর্তার তাকে ভালো রাখবেন, শান্তিতে রাখবেন।