Proshno

tumblr site counter


প্রশ্ন



কেমন আছেন ? কি করছেন ? বাড়ি কই? শরীর কেমন? এরকম শত শত প্রশ্নকে আমরা আর প্রশ্ন মন করি না । টুথ ব্রাশ করা, নাস্তা করা , ঘুমানোর মত এই সব প্রশ্ন আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে। বেশীর ভাগ উত্তর আমাদের মুখস্ত।প্রশ্ন শুনা মাত্র আমরা উত্তর দিয়ে দেই। অনেক প্রশ্ন শুধুই প্রশ্ন , যে করছে আর যে উত্তর দিচ্ছে , দুই জনই জানে এটা শুধু লৌকিকতা । অন্তরের তাগিদ কোনটার মধ্যে নেই ।

 

বেচারা গোপাল ভাড় একবার দিগম্বর হয়ে বাড়ি ফিরলেন বাজার থেকে । হাতে ঝোলানো ছিল বড় একটা মাছ । পথে যাতে শত শত মানুষ মাছের দাম জিজ্ঞাসা না করে তার জন্যে তাকে কাপড়-চোপর খুলে হাটতে হয়েছিল । ভানু পঞ্চাশটা প্রশ্ন করে জানিয়েছিলেন, তা হলে যুদ্দেই যামু না । প্রশ্ন যেমন মানুষকে দিগম্বর করছে , তেমন নন্দ লালও তৈরী করছে । যারা শুধু প্রশ্ন করে, কথা বেশী ভালবাসে । আসল কাজ করতে দিলে, তাদের গতরের অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

বাংলাদেশে ঢাকার ফ্লায়িং ক্লাবে প্লেন চালানো শেখানো হত । সবাই জানত এটা অনেক টাকা পয়সার ব্যাপার । আমার পরিচিত একজন সেখানে ভর্তী হয়েছিল ।পথে ঘাটে সবাই তার কাছ থেকে জানতে চেতো , ঘন্টা প্রতি কত খরচ হচ্ছে । এমন মানুষও ছিল যারা , যতবারই তার সাথে দেখা হোক একই প্রশ্ন করত । ভাব অনেকটা প্রয়োজনীয় টাকা জমলেই , প্লেন চালানোটা শিখে ফেলতে হবে । বলা তো যায় না , কখন কোনো কাজে চলে আসে । প্রথম পরিচয়ে খরচের প্রশ্ন, ঢাকা শহরের শুধু একজন করেন নি । উনি ছিলেন গ্রাম থেকে সদ্য আসা একজন মৌলভী সাহেব । তিনি অবশ্য জানতে চেয়েছিলেন , কি করেন পর্যন্ত । প্লেন চালানো শেখে , জানার পরে তার মনেও কি আকাশে উড়ার ইচ্ছে হয়েছিল কি না তা জানা যায় নি ।আমেরিকার প্রবাস জীবনেও এর থাকে নিস্তার নাই । মানুষে যখন শুনে, বাড়ির ঋন দেয়, এমন এক ব্যাংকে আমি চাকরী করি , তখন দেখি, বর্তমানে সুদের হার (interest rate) কত এ প্রশ্ন যেন সবাইকে করতেই হয় । যার বাড়ি কেনার বর্তমানে কোনো ইচ্ছে কিম্বা সব্ভবানা নাই , এরকম মানুষ থেকে আরম্ব করে যে আগের দিন বাড়ি কিনেছে এমন মানুষও একই প্রশ্ন করে ।

ঠিক বুঝতে পারি না , এরকম প্রশ্ন করার কি কারণ । যার বাড়ির কেনা আপাতত সব্ভবানা নাই, তিনি হয়ত প্রশ্ন করে নিজের অবস্তানটা বুঝে নেন, কবে বাড়ি কিনলে বুদ্ধিমানের মত একটা কাজ হবে । যিনি ইতিমধ্যে বাড়ি কিনে ফেলেছেন , তিনি হয়ত মনে মনে হিসাব করে নেন , এখানকার সুদের থেকে তার সুদের পার্থক্য। বেশী হলে আর্তপ্রাসাদ , কম হলে মুখটা কিছুটা কালো করা । যাই হোক প্রথম দিকে মানুষকে বলতাম , ভাই দেখেন ব্যাংকে কাজ করলেও , আমাকে সুদ নিয়ে কাজ করতে হয় না । মানুষ এ উত্তর পছন্দ করতো না । অনেকে বাকা মন্তব্যও করেছেন । এখন মানুষদের খুশী করার জন্যে সুদের হারের খবর আগেই আমি নিয়ে রাখি ।

প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিজের বীরত্ব প্রকাশ করতে আমরা প্রচন্ড আগ্রহী । একবার এক অনুষ্ঠানে আমার পাশে বসলেন এক সময়কার খুবি বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়ার । দেশের মানুষ তাকে এক নামে চিনতো । তিনি আশা করছিলেন আমি তার বর্নাট্য জীবন নিয়ে তাকে প্রশ্ন করি । কিন্তু আমার সাধারণ প্রশ্ন তাকে সন্তুষ্ট করতে পারল না । আমি জানতাম তিনি কে । কারণ আমাকে একজন আগেই তার কথা বলেছিল । তিনি হয়ত চাচ্ছিলেন , আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আরেকবার তার কীর্তি কথা প্রচার করতে , দেশ আর জাতির জন্যে তার অবদানের কথা বলতে । কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি আমার পাশ থেকে উঠে গেলেন । মিনিট তিনেকের মধ্যে আরেক ভদ্র লোকের কাছে তিনি বেশ শব্দ করেই তার অনেক ধরনের সাফল্যের কথা বলতে লাগলেন । আমি যাতে তা পরিস্কার শুনতে পাই ।

আসলে ব্যক্তি না তার কর্ম আমাকে আকৃষ্ট করে । একবার এক মহিলা আমার কথায় খুব বিরক্ত হয়েছিলেন । তিনি অনেক ধরনের কসরত করে এক বড় গানের শিল্পীর সাথে ছবি তুললেন, অটোগ্রাফ নিলেন । এর পর সবাইকে তা দেখাতে আরম্ভ করলেন । সাথে বোনাস হিসাবে বলতেন তার অভিজ্ঞতার কথা । আমি বললাম গান তো অটোগ্রাফ দেয় না । ব্যক্তি আর তার কর্মকে আমি এক করে দেখি না । মহিলার মনে হয়ত ছিল, আমিও আর সবার মত তাকে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করি । তারও হয়ত ফুটবল তারকার মত নিজের প্রচার গাথা ছড়াতে ইচ্ছে করছিল । দুঃখিত প্রাক্তন ফুটবল আর মহিলা । আমি আপনাদের ঠিক মত প্রশ্ন করতে পারি নি। আমি জানি, আমি আপনাদের ঠিক মতো প্রশ্ন না করতে পারলেও , আপনাদেরকে আকাশের নিল ধ্রুবতারাও প্রশ্ন করে ।

ক্লাস এইটে যখন পড়ি, বৃটিশ কিছু বিশেষজ্ঞ আসলেন স্কুল পরিদর্শনে । তাদের রিপোর্টের উপর কুমিল্লার বিখ্যাত আবাসিক স্কুলের একটা সম্মানের বিষয় জড়িত ছিল । স্কুল ঘষা মজা করে পরিষ্কার করা হয়েছিল । আর আমাকে প্রস্তুত করা হয়েছিল তাদেরকে প্রশ্ন করার জন্যে । তারা যখন ক্লাস রুমে এলেন , বায়ান্ন জন ছাত্র আমার দিকে তাদের দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো । কারণ তারা জানত আমাকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব দেয়া আছে । অবশ্য তাদের বলা হয় নি পরিদর্শকদের সামনে এমন কিছু না করতে পারে , যাতে পরিদর্শকরা বুঝতে পারেন প্রশ্নগুলো আমাকে আগের থেকে সেখানে আছে । ক্লাসের সবগুলো দৃষ্টি যখন আমার দিকে , আমি তখন বেশ নার্ভাস হয়ে গেলাম । যে প্রশ্ন গুলো শেখানো হয়েছিল , তার একটাও মনে করতে পারলাম না । তোতা পাখী, শেখানো গান করতে পারল না

ভাবছিলাম কখন বাঙালিরা প্রশ্ন করে না । শিক্ষকরা পড়া বুঝানোর পরে , যখন বলেন না বুঝলে প্রশ্ন করতে । দেখা যায় , ছাত্রদের কোনো প্রশ্ন নাই । পরে যখন শিক্ষক প্রশ্ন করেন , তখন খুব কম ছাত্রদের থেকে উত্তর শোনা যায় । আরেকটা জায়গার কথা মনে আসল । ধর্মীয় জায়গা গুলোতে শুধু বলেই যাওয়া হয়। মনে প্রশ্ন আসলেও করাটা যেন সংগত না। বড় সাহেবকে "জ্বী হুজুর " বলা ছাড়া অনেকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকেন । পাছে বড় সাহেব যদি কিছু মনে করেন ।

অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আমাদের জীবনে একটা বড় অংশ হয়ে আছে । চাকরীর পরীক্ষা দেওয়ার আগে আমাদের জেনে যেতে হয় পৃথিবী থেকে চাঁদ , সূর্যের দুরত্ব , চাদের ওজন , সূর্যের তাপমাত্রা আর আরো কত কি । এই জ্ঞান কি আসলে চাকরীতে ব্যবহার হয় । অন্যদিকে আমাদের ছোট শিশুরা অনেক প্রশ্ন করে । প্রথমে উৎসাহ পেলেও , পরে আমরা বিরক্ত হতে থাকি । কিন্তু শিশুরা এই উত্তরের উপর তাদের জ্ঞানেরের ভান্ডার গড়া আরম্ভ করে । অন্যদিকে আমারা বড়দের অকারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে কোন ক্লান্তি বোধ করি না । অনেক সময় প্রশ্নের আগেই উত্তর দিয়ে দেই। ছোটদের প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামাই না । আর ছোটরা বড় হয়ে, আমাদের অকারণ প্রশ্ন রাজ্যত্তের মালিকানা নেয়।

ফলাফল : যুক্তি আর ভাবুক মনের প্রশ্ন , তার উত্তর আর সেই হিসাবে কাজ , আমাদের সংস্কৃতি থেকে দূরেই থেকে যায়

 

১২/২৬/১০

Texas, USA